নিয়োগের এসব কার্যক্রম বাতিলের সুপারিশ

0
29

পান্না, রাজশাহী ব্যুরো :
রুয়েটের সদ্য সাবেক উপাচার্য রফিকুল ইসলামের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩০ আগষ্ট। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে স্বজনপ্রীতি করে ভাই, শ্যালক, শ্যালিকাসহ আত্মীয়স্বজনদের নিয়োগ দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তে নামে ইউজিসি। তদন্ত করতে গিয়ে ইউজিসির কমিটি দেখতে পায় নিয়মের কোনো ধার ধারেননি রুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার। ইচ্ছেমতো পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে প্রভাষক পদে এক প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষায় ৩০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে ৬, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় তাঁকে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর (কাটাকাটি) করে কেয়ারটেকারের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দুই জনকে। আবার অনুমোদনহীন একটি পদে এক প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় সপ্তম হলেও তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর দিয়ে প্রথম বানিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনুত্তীর্ণ এক প্রার্থীর ফল টেম্পারিং করে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞাপির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের মে মাসে জুনিয়র সেকশন অফিসার পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এ পদে উপাচার্যের আপন ভাই লেবাররুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যের ভাই লিখিত পরীক্ষায় অষ্টম হলেও তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মানও যেমন খুবই নিম্নমানের ছিল, তেমনি উপাচার্যের ভাইয়ের উত্তরপত্রও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

‘পিএ টু ডিরেক্টর’-এর দুটি পদের বিপরীতে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদে উপাচার্যের শ্যালক সোহেল আহমেদও নিয়োগ পান। কমিটি দেখতে পায় সোহেল আহমেদ লিখিত পরীক্ষায় ৩০-এর মধ্যে ১১ নম্বর পেয়ে সপ্তম হন। কিন্তু তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় ৫০-এর মধ্যে ৪৩ নম্বর দিয়ে প্রথম বানিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ মৌখিক পরীক্ষায় অন্য প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ৩০ নম্বর দেওয়া হয়। আবার নিয়োগ পাওয়া তিনজনের একজনকে ‘পিএ টু ডিরেক্টর (আইকিউএসি)’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এই পদটি অনুমোদিতই নয়। এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে বাছাই বোর্ডে সভাপতি করা হয়।
ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের একটি পদের বিপরীতে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে উপাচার্যের শ্যালিকা মোছা. মাছুমা খাতুনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়। কেয়ারটেকারের (গেস্টহাউস) একটি পদের বিপরীতে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়; যেখানে উপাচার্যের ফুফাতো ভাই মেহেদী হাসানও আছেন। মেহেদী হাসানসহ নিয়োগ পাওয়া অপর ব্যক্তির মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কাটাকাটি অর্থাৎ টেম্পারিং করা হয়েছে, যাতে স্বাক্ষর (ইনিশিয়াল) দেওয়া নেই বলে দেখতে পায় কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ২২ মে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬ জন শাখা কর্মকর্তা (সেকশন অফিসার) পদের বিপরীতে ১৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। রুয়েটের সংবিধি মোতাবেক এই পদের বাছাই কমিটির সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অফিস প্রধান হিসেবে রেজিস্ট্রার হলেন সদস্য। কিন্তু কমিটির মোট সদস্যসংখ্যা ছয়জন হলেও এই বাছাই বোর্ডে প্রকৃতপক্ষে দুজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। উপাচার্য রফিকুল ইসলাম সেখের আপন ভাই মো. মুকুল হোসেন প্রার্থী হওয়ায় (নিয়োগও পান) তাঁর পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. সেলিম হোসেন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে এবং সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ছয় সদস্যের বাছাই বোর্ডে মাত্র দুই সদস্যের উপস্থিতিতে নিয়োগের সুপারিশ পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার মধ্যে আবার ছয়টি পদের বিপরীতে ১৩ জনকে নিয়োগ দেওয়ায় আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তখনকার উপাচার্য রফিকুল ইসলাম সেখের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়াও আইন মেনে করা হয়নি। তাই আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী অবৈধ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গৃহীত এসব কার্যক্রম শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

তিনটি মালি পদের বিপরীতে ৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি দেখেছে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ও মোট প্রাপ্ত নম্বরে অনেক কাটাকাটি করা হয়েছে। এই পদে লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ মো. মোন্তফাকে টেম্পারিং করে মৌখিক অস্বাভাবিক নম্বর দেওয়া হয়েছে। তাঁকে ৫০-এর মধ্যে ৪৮ নম্বর দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদেরও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া ‘পছন্দের ব্যক্তিদের’ মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এমন পদের মধ্যে কেমিক্যাল অ্যান্ড ফুড প্রোসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক পদে মাহবুবা জান্নাত নামের একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় ৩০ নম্বরের মধ্যে ৬ পান। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। কমিটি বলছে, ৩০-এর মধ্যে ৬ নম্বর পাওয়া কোনোভাবেই পাস নম্বর হতে পারে না।

রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তিনটি মালি পদের বিপরীতে ৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি দেখেছে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ও মোট প্রাপ্ত নম্বরে অনেক কাটাকাটি করা হয়েছে। এই পদে লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ মো. মোস্তফাকে টেম্পারিং করে মৌখিক অস্বাভাবিক নম্বর দেওয়া হয়েছে। তাঁকে ৫০-এর মধ্যে ৪৮ নম্বর দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

গত বছরের ৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় বিভিন্ন নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হলেও ওই সভার কার্যবিবরণী (রেজল্যুশন) আইন ও বিধি মোতাবেক অনুমোদন করা হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়। নিয়মানুযায়ী ৯২তম সিন্ডিকেট সভার কার্যবিবরণী এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক নথিতেও অনুমোদিত হয়নি। তাই নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান কর্তৃত্ববহির্ভূত। তৎকালীন উপাচার্য রফিকুল ইসলাম সেখ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম হোসেন তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাই নিয়োগসংশ্লিষ্ট অনিয়মে জড়িত থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউজিসি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়োগ বোর্ডে ইউজিসির পর্যবেক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগের এসব কার্যক্রম বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে রফিকুল ইসলাম সেখ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম হোসেনের বিরুদ্ধে ‘বিধি মোতাবেক’ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে গতকাল বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান ও ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মো. আবু তাহের বলেন, তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদন ইউজিসির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছেন। পরে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সদ্য সাবেক উপাচার্য রফিকুল ইসলাম সেখের মুঠোফোনে কল করলে রিং হলেও তা রিসিভ করেনি। পরে কল করলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। আর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম হোসেন মুঠোফোনে কল রিসিভ করে পরিচয় জানার পর ফোন বন্ধ করে দেন। এরপর কল করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রুয়েটের উপাচার্যের দুর্নীতির তদন্ত কমিটিতে প্রমাণিত। তদন্ত প্রতিবেদন কমিটিতে জমা দিতে বলা হয়েছে।