চিড়িয়াখানায় বিরল প্রজাতির শতাধিক গাছ সাবাড়, সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

0
13

পান্না, রাজশাহী ব্যুরো :
রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় কোন দরপত্র ছাড়াই গোপনে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব। সুকৌশলে কেটে নেয়া হয়েছে শতাধিক বড়বড় মূল্যবান বৃক্ষ। গত কয়েক দিন ধরেই এক দল শ্রমিক কেটে নিয়ে যাচ্ছেন মূল্যবান এসব গাছ। এই খবর জানাজানি হবার পর চিড়িয়াখানায় সাংবাদিক প্রবেশে মৌখিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র ছাড়াই এরই মধ্যে কেটে নেয়া হয়েছে শতাধিক বড়বড় মূল্যবান গাছ। গাছগুলো কাটছেন রাজশাহী নগরীর লক্ষ¥ীপুর ভাটাপাড়া এলাকার রবিন নামের এক ব্যবসায়ী। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নির্বিচারে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন রবিনের লোকজন। এতে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর যেমন ক্ষতি সাধন হচ্ছে তেমনি বিশেষত্ব হারাচ্ছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান।

জানা যায়,চিড়িয়াখানার এই জায়গাটি বৃটিশ আমলে ঘোড়দৌড়ের মাঠ ছিলো। ঘোড়ার রেস ও টমটম বন্ধ হওয়ার পর এই রেসকোর্স ময়দান পরিত্যক্ত ছিল দীর্ঘদিন যাবৎ। নগরবাসীর বিনোদনের আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে তৎকালীন মন্ত্রী শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান এখানে কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

পরবর্তীতে উদ্যানের সৌন্দর্য্য বাড়াতে বহু মূল্যবান গাছের চারা রোপণ, ফুল গাছের কোয়ারি ও কুঞ্জ তৈরি, লেক ও পুকুর খনন, কৃত্রিম পাহাড় নিমার্ণের মতন কাজ করা হয় ১৯৭৪ সালের দিকে। ওই সময় কিছু দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষরোপণ করা হয় উদ্যানে। নগরীর মানুষের মনোরঞ্জন ও বিনোদনের প্রয়োজনে বিভিন্ন পশুপাখি ও জীবজন্তুও আনা হয় পর্যায়ক্রমে। এর ফলে শুধু রাজশাহী নগরীই নয়; বরং রাজশাহী নগরী তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। সম্প্রতি সেসব গাছের বেশকিছু কাটা পড়েছে নভোথিয়েটার নির্মাণের জায়গা করে দিতে। আর এখন উন্নয়ন কাজের নামে উজাড় হচ্ছে শতাধিক গাছ।

অনুসন্ধানে জানা যায়,চিড়িয়াখানা পরিচালনার করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। অভিযোগ উঠেছে, এই কাÐের পেছনে রয়েছেন চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাসিকের কর্মকর্তারা। তারাই প্রায় আট লাখ টাকায় গাছগুলো বিক্রি করেছেন। পানির দরে গাছ বিক্রি করে এই টাকা সংশ্লিষ্টরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। রোববার সাংবাদিক পরিচয়ে চিড়িয়াখানায় গেলে প্রবেশে বাধা দেন নিরাপত্তা কর্মীরা।

দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার সিরাজুল ইসলাম জানান, চিড়িয়াখানায় সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ করেছে কর্তৃপক্ষ। তাকে বিষয়টি জানিয়েছেন চিড়িয়াখানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা আলমগীর কবির। তিনি কর্তার আদেশ পালন করছেন মাত্র।

বুধবার (৩০/০৯/২০) তারিখে পরিচয় গোপন করে সোমবার সকালে চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই চোখে পড়ে উদ্যানজুড়ে গাছ কাটার দৃশ্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা কাটা ডালপালা, গাছের গুড়ি সরাতে ব্যস্ত শ্রমিকরা।

একদল শ্রমিক ঘড়িয়ালের পুকুরের পাশে বড় বড় মেহগুনি গাছ কাটছিলেন। কিছু শ্রমিক সরাচ্ছিলেন কেটে নেয়া গুড়ি। এই কর্মযজ্ঞে যুক্ত প্রায় ৩০ জন শ্রমিক। শ্রমিকারা জানান, আপেশপাশের প্রায় সব গাছে লাল রং দিয়ে নম্বর দেয়া। নম্বর দেয়া সব গাছ পর্যায়ক্রমে কাটার কথা জানান।

উদ্যানের ভেতরে কৃত্রিম পাহাড়ের আশেপাশে পড়ে রয়েছে কেটে নেয়া গাছের ডালপালা। এক পাশে গাছ কাটা গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করছিলেন শ্রমিকরা। যে স্থানে গাছ সাবাড় করা সম্পন্ন হয়েছে সেই স্থানে ডাল-পালা এমনকি পাতা পর্যন্ত সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কেউ যেনো সহজে বুঝতে না পারে সেই কারণে মাটি দিয়ে তা সুন্দর করে ভরাট করা হয়েছে সেই স্থানটি।
নাম প্রকাশ না করে গাছ কাটায় নিযুক্ত এক কর্মী জানান, রবিন নামের এক ব্যক্তি গাছগুলো কাটার কাজ পেয়েছেন। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে তারা গাছ কাটছেন। চিড়িয়াখানার ভেতরে তাদের ২০০ গাছ কাটার অনুমতি রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাসিকের উদ্যান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি বলেন, পার্কের ভেতর কিছু প্রবেশ করতে কিংবা বের করতে হলে আমাকে জানাতে হবে। কিন্তু গাছ কাটার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। এ বিষেয়ে যোগাযোগ করা হলে কাছ কাটা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি ব্যবসায়ী রবিন।

এবিষয়ে উদ্যানের উদ্ভিদতত্ত¦বিদ হেলেন খাতুন বলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনে সাধারণত সব বিরল প্রজাতির গাছ থাকতে হয়। এত সাধারণ গাছ থাকার তো দরকার নেই। সে জন্য গাছগুলো কাটা হচ্ছে। সেখানে বিরল প্রজাতির গাছ লাগানো হবে। তবে টেন্ডার হয়েছে কী না- এ ব্যাপারে রাসিকের কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। এ বিয়ে বিষয়ে চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলতে পারবেন বলে জানান রাসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রাসিক মেয়রের একান্ত সচিব আলমগীর কবিরের জানান, ‘গাছের ডালপালা কাটার জন্য বলা হয়েছে। গাছ তো কাটতে বলা হয়নি। আর এর জন্য কোনো টেন্ডারও হয়েছে কী না- তাও আমার জানা নেই।’ তবে চিড়িয়াখানায় সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষেয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন নির্দেশ তিনি দেননি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে