চলে গেলেন চারঘাটের বীরাঙ্গনা সন্যাসী রাণী

0
448

 

স্টাফ রিপোর্টার,চারঘাট:
রাজশাহীর চারঘাটের সেই বীরাঙ্গনা সন্যাসী রাণী আর নেই। গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বার্ধক্য জনিত কারণে অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না..ইলাহে রাজেউন।মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৭ বছর।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের লালসার শিকার হয়ে যেসকল বাঙালি নারী ধর্ষিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু তাদের বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন; চারঘাটের সন্যাসী রাণী ছিলেন তাদেরই একজন।কিন্তু সরকারী ভাবে তিনি স্বীকৃতি পাননি।

জানা যায়,পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে রাজশাহী জেলার চরঘাট উপজেলা সদরে মধ্যবিত্ত বনেদী পরেবারে সন্যাসীর জন্ম হয়। তার পিতা কিশোরী চন্দ্র সাহা এবং মা গংগা রাণী সাহা। দুই ভাই বোনের মধ্যে সন্যাসী রাণী ছোট। ৬০-এর দশকে বাবা মা ঘটা করে সন্যাসীর বিয়ে দেন স্থানীয় যতীন চন্দ্র সাহার সাথে। কিন্তু বিধি বাম বিয়ের মাত্র তিন বছরের মধ্যে এক সন্তান রেখে স্বামী মারা যান। সন্যাসীর সিঁথির সিঁদুর উঠে যায়। তিনি হয়ে পড়েন বিধবা। হিন্দু ধর্মের কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তার আর বিয়ে করা হয়নি। একমাত্র সন্তান নারায়ণকে অবলম্বন করে তিনি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন।

আসে ১৯৭১ সাল। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। ১৩ এপ্রিল পাক বাহিনী অতর্কিত ভাবে চারঘাট আক্রমন করে। পাক বাহিনীর অবিরাম গুলি বর্ষণে সেদিন মুক্তিযোদ্ধাসহ শতাধিক ব্যক্তি শহীদ হন। তাদের মধ্যে সন্যাসীর বাবাও ছিলেন। এলাকার অনেক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হলে অধিকাংশ মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতের বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সন্যাসী রাণী বাবা ও স্বামীকে হারিয়ে শোকে মূহ্যমান হয়ে চারঘাটের মাটিতেই থেকে যান।

চারঘাটের বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। এদেশীয় দালালরা সারদা পুলিশ একাডেমী ক্যাম্পে পাক বাহিনীর হাতে তুলে দেয় সন্যাসী রাণীকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ নয় মাস নরপিশাচরা সন্যাসীর দেহ কুঁরে কুঁরে খায়। দেশ যখন স্বাধীন হলো সন্যাসী তখন অন্তঃসত্তা। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সন্যাসী এক সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান দু’টির হদিস তার জানা নেই।

সংসারে আপন বলতে তার কেউ ছিলোনা তার। অসুস্থ হয়ে কংকালসার হয়ে গিয়েছিল তার দেহ। খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই। নিজের কোন জায়গা জমি বাড়ি ঘর নেই। মানুষের করুণা ভিক্ষা করে তিনি বেঁচে ছিলেন। সম্বল বলতে সরকারের দেয়া বয়স্ক ভাতা ছিল। কেউ তাকে ভালোবাসতো আবার কেউ তাকে ‘পাগলী’ বলে নিষ্ঠুর রসিকতা করতো। বয়সের ভারে ন্যুব্জ সন্যাসী রাণী সবাইকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতো। সকাল থেকে রাত অবধি চারঘাট বাজারের পথে পথে আপন মনে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। উপজেলা সদরে থানা রোডের পাশে একটি খুপড়ি ঘরে (কুঁড়ে ঘরে) জীবনের শেষ বেলায় এসে একাকি থাকতেন বীরাঙ্গনা সন্যাসী রাণী।

শনিবার বিকাল ৫ টায় চারঘাট কেন্দ্রীয় শ্বাশানে সন্যাসী রাণীর শেষকৃত্য সম্পূর্ণ হয়।এ সময় উপস্থিত ছিলেন (চারঘাট – বাঘা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রায়হানুল হক, সাবেক পৌর মেয়র নার্গিস খাতুন,চারঘাট সোয়ালোজের পরিচালক মাহমুদা বেগম গিনিসহ আরো অনেকে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে